মেনু নির্বাচন করুন

হাজীগঞ্জ বাজার

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, যখন হাজী দোকানের সুখ্যাতিতে হাজীগঞ্জ বাজারটি গড়ে উঠেছিল সে সময় বর্তমান বাজার এলাকার প্রায় সবটুকু ভূমিই হিন্দু মালিকানাধীন ছিল। মকিমাবাদ, বলাখাল প্রতাপশালী হিন্দু জমিদার ও রামপুর চৌধুরীদের খাস দখলীয় ভূমি ছিল। তার পূর্ব প্রান্তে কোম্পানির রাস্তার সংযোগ সেতুর পশ্চিম-উত্তর এলাকাটি লাকসামের কালীবাবুর (রায় বাহাদুরের) খাস দখলীয় সম্পত্তি ছিল। পূর্ব থেকেই বর্তমান বাজার এলাকায় মুসলিম বসতি বা ব্যবসায়ী মালিকানাধীন সম্পত্তি ছিল না বললেই চলে। মনাই হাজী (রহঃ)’র উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় মুসলমানগণ ব্যবসায় তেজারতীর দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষত ১৯০৬ ইং সালে ঢাকা শহরে নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার ফলে সারা উপ-মহাদেশে মুসলিম পুনজাগরণের সাড়া পড়ে যায়। এ এলাকায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। 

সময়ের তাগিদে সরু রাস্তার দু’ধারের নিম্ন ভূমির অর্থাৎ ফসলী কিংবা অনাবাদি জমির অংশ রাস্তা বরাবর উঁচু করার লক্ষ্যে পার্শ্ববর্তী জমি কেটে তা করা হয়, যার ফলে রাস্তার দু’ধারে হাজা-মজা পুকুর-ডোবার সৃষ্টি হয়। অতঃপর সম্প্রসারণের প্রয়োজনে দূর-দূরান্ত হতে মাটি এনে পুকুর ডোবা ভরাট করা হয় এবং রাস্তার সাথে তাল মিলিয়ে দু’পাশ ভরাট ও উঁচু করা হয়। বর্তমান বাজারের পূর্ব প্রান্তেও কালী বাবুদের এলাকার রাস্তার সংলগ্ন উত্তর পার্শ্বে বড় পুকুর ছিল। বর্তমান তরকারী বাজারের দক্ষিণে হাজা-মজা বড় চরা পুকুর ছিল। পশ্চিম প্রান্তে রাস্তার দক্ষিণ দিকে মকিমাবাদ চৌধুরীদের একটি দীঘি ছিল। বাজার গড়ে ওঠার তথা সম্প্রসারণের প্রয়োজনে পুকুরগুলি একের পর এক ভরাট হয়ে শুধুমাত্র পশ্চিম মকিমাবাদ চৌধুরীদের দীঘিটি পুকুরের অস্তিত্ব রক্ষা করে এখনও বিরাজমান। উল্লেখ্য, মসজিদের পশ্চিমে গাজীর খাদা, মসজিদের মাঝখানে পুকুর, মসজিদের মাঠে পুকুর, কাঠ বাজারে ডোবা, হোগলা হাটের পূর্বদিকে বড় পুকুর ভরাট করে বি,ও,সি, মিল ও নতুন বাজার, হালি হাটে বড় পুকুর এভাবে কোম্পানি রাস্তার দুই পার্শ্বে পুকুর ডোবায় ভর্তি ছিল, যা সময়ের চাহিদায় ভরাট হয়ে যায়। বাংলা ১৩০১ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া রেল কোম্পানি মেঘনার পূর্বপাড়ে রেল লাইন বসিয়ে রেলগাড়ি চালু করলে চাঁদপুর নদী বন্দরের সাথে যোগাযোগের লক্ষ্যে লাকসাম হতে চাঁদপুরের মধ্যবর্তী অন্য স্থানের ন্যায় হাজীগঞ্জেও রেল ষ্টেশন স্থাপিত হয়। ষ্টেশনের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য বর্তমান মসজিদ ভিটির পশ্চিম দিক দিয়ে ষ্টেশন পর্যন্ত জমির মাটি কেটে ভরাট করা হয়, ফলে রাস্তা ও তার পাশে খালের সৃষ্টি হয়। মসজিদ ভিটির উত্তরে নালা কেটে জলপথের সংযোগ সৃষ্টি করা হয় যা পরবর্তী সময়ে পুল তৈরির মাধ্যমে চলাচল আরও সুগম হয়। অর্থাৎ ষ্টেশন পর্যন্ত মাটির রাস্তা ও জলপথ পৌঁছায়। 

মনাই হাজী (রঃ)’র স্মৃতিতে ধন্য হাজীগঞ্জ মোকামটির নদী ও রেলপথে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ রক্ষার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ এলাকাটিতে তৎকালীন পাট ব্যবসায়ী ইংরেজ বণিকগণ কয়েকটি পাট ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করেন। মনাই হাজী (রহঃ)’র দোয়ায় ধন্য এলাকাটি উজান ও ভাটি অঞ্চলের সাথে নৌপথে সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবেও ব্যবসায়ীদের চোখে পড়ে। পণ্য বহনকারী নৌকাগুলো মালামাল আমদানি-রপ্তানিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। হাজীগঞ্জে বিভিন্ন পণ্যের বড় বড় আড়ৎ গড়ে উঠে। বলাখালের হরিশ চন্দ্র সাহা নামে একজন উদ্যমশীল পাট ব্যবসায়ী সেতুর পূর্ব পাড়ে কোম্পানির রাস্তার পার্শ্বের বিস্তীর্ণ এলাকা খরিদ করে মধ্যস্থলে বিরাট একটি দীঘি কেটে বিদেশী পাট ক্রয়কারী কোম্পানিদের জন্য অফিস ও গুদামের ব্যবস্থা করেন। ফলে বাজার পূর্ব দিকে সম্প্রসারিত হতে থাকে। 


অপরদিকে বড়কুল হিন্দু প্রধান এলাকার ব্যবসায়ীগণ কোম্পানি রাস্তার পার্শ্বে নদীর পাড় ঘেষে বহু গুদাম ও আড়ৎ খুলে এলাকাটি জুড়ে বসে। এভাবে পূর্বদিকে টোরাগড় মৌজা পর্যন্ত বাজার সম্প্রসারিত হয়। হিন্দু ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মুসলমান ব্যবসায়ীগণও বিভিন্ন পণ্য রপ্তানিতে কলিকাতার সাথে বাণিজ্য করে এবং বাজারে পাট, তামাক, সুপারিসহ বিবিধ পণ্যের দোকান ও বড় বড় আড়ৎ গড়ে তোলেন। ঘরবাড়ি ও দোকান পাট ক্রয়পূর্বক মুসলমানগণও নিজেদের আবাস গড়ে হিন্দু ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং ইদানিংকালেও হরি সাহার বোয়ালজোর খাল পাড়ের গদিটি খান সাহেব জুনাব আলী মুন্সীর ক্রয় সূত্রে মালিকানাধীকারে আসে। তাছাড়া আলহাজ্ব আব্দুল হামিদ মুন্সী এবং আরো কয়েকজন মুসলমান ব্যবসায়ী সুখ্যাতি অর্জন করেন। আহমাদ আলী পাটওয়ারী সাহেব তাঁর ব্যবসায়ীক ধারাবাহিকতায় মুদি পণ্যের দোকান ছাড়াও বার্মা থেকে আনা মূল্যবান কাঠের বড় আড়ৎ, কেরোসিন তেলের এজেন্সি, মোমবাতির ফ্যাক্টরি, সাবানের ফ্যাক্টরি, বড় জেনারেটর বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ প্রভৃতি ব্যবসায়ীক কার্যক্রমের উদ্যোক্তা ছিলেন। দক্ষিণ পার্শ্বের বড়কুল জোটের অধিকৃত এলাকা প্রাক্তন চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মুন্সী, সুলতান আলম ভূঁইয়া প্রমুখ মুসলিম ব্যবসায়ীগণের আওতায় আসে। পরবর্তীতে মূল বাজার এলাকায় আরও কিছু ভূমি আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহঃ) ক্রয় করেন। এভাবে এ এলাকার সমুদয় পরিবর্তন অলীদের আগমন ও দোয়ায় এবং বর্তমানে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের বিশেষ বরকতে আল্লাহ্র ইচ্ছায় সংগঠিত হচ্ছে। কোনো মুসলমান হাজিগঞ্জ আসার বিষয়ে চিন্তা করলে প্রথমে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের কথাটি তার মনে ভেসে ওঠে। এটা এ এলাকার প্রতি আল্লাহ্তায়ালার রহমত বৈ আর কি হতে পারে? পশ্চিম দক্ষিণে নদীর পাড় পর্যন্ত এমন কি সারা মকিমাবাদ মহল্লাটিই এখন প্রায় মুসলিম আবাসভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ এলাকায় হিন্দু মুসলমানের সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক বহু পূর্ব থেকেই বিরাজমান। অলীয়ে কামেল হাজী মকিমউদ্দিন (রহঃ) ও তাঁর বংশধরগণের রূহানী তাওয়াজ্জোহে এ এলাকা প্রশংসিত ও উজ্জীবিত। টোরাগড় সীমানায় দক্ষিণ পার্শ্বে নদীর পাড়ে ওয়াপদা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মিয়ার ত্যাগে জেলা বোর্ডের দ্বারা পরিচালিত দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপিত হয়। তারই সংলগ্ন পূর্বে ভূতপূর্ব আইন পরিষদের সদস্য খান সাহেব মরহুম জুনাব আলী মুন্সী হাজীগঞ্জে সভা সমিতি এবং খেলাধুলার জন্য মাঠ দান করেন। এটি জুনাব আলী ময়দান নামে খ্যাত। চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মিয়া, খান সাহেব আমিন মিয়া দীর্ঘদিন হাজীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। উভয়ে বাজারের প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন সাহেব একক প্রচেষ্টায় হাজীগঞ্জ হামিদিয়া জুট মিলস নামে একটি চটকল স্থাপনে উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহিত করে তা প্রতিষ্ঠিত করেন। সংযোগ সেতুর দিকে বোয়ালজোর খালের পশ্চিম পাড় ধরে উত্তর দিকে ধড্ডা কলিমউদ্দিন মিয়া সাহেব তার মালিকাধীন ভূমির মাঝখানে বিরাট এক দীঘি খনন করে একটি মার্কেট স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সম্ভবত তাঁর মনের অবস্থার পরিবর্তনে তা হয়ে উঠেনি। দীঘির উত্তর-পূর্ব অংশে সরকারি মাল গুদাম স্থাপিত হয়। এ এলাকার দক্ষিণ অংশটি জেলা বোর্ডের দখলে এনে ডাক বাংলো স্থাপন করা হয়। পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে ডাকঘর এবং তারও পশ্চিমে ১৯৬৮ সনে হাজীগঞ্জ থানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে কচুয়া, শাহরাস্তি, ফরিদগঞ্জসহ বিরাট এলাকা তথা পার্শ্ববর্তী দূর-দূরান্তের এলাকা সমূহকেও হাজীগঞ্জ থানার কার্যক্রম বা প্রশাসনের আওতাভূক্ত করা হয়। ফলে হাজীগঞ্জ বাজার এলাকাটি লোক সমাগম ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও জমজমাট হয়ে উঠে। মুসলিম ব্যবসায়ী ও ক্রেতা বিক্রেতার সংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ্ মনাই হাজী (রহঃ)’র নেক মকছুদ পূর্ণ করেছেন। ধন্য হয়েছে হাজীগঞ্জবাসী। হিন্দু জমিদার প্রতিপত্তির উত্তরকালে ধীরে ধীরে মুসলমানগণও দেয়ানে-দরবারে, বিচারে-আচারে, বুদ্ধি-বিবেচনায় এলাকার প্রাণরূপে ভূমিকা রাখেন। তাদের মধ্যে মকিমাবাদের আজগর আলী ব্যাপারী, ওহাব আলী বেপারী, মনীনাগের কাশেম আলী মজুমদার, ধেররার মরহুম আবদুল আজিজ চৌধুরী প্রমুখের নাম সশ্রদ্ধ চিত্তে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


Share with :

Facebook Twitter